মোংলার শ্রমিক নেতা শাহজাহান শিকারীর বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
আমি একজন শ্রমিকের সন্তান, আর একজন শ্রমিকের সন্তান হিসেবে আমি শতভাগ গর্বিত ও কৃতজ্ঞ মহান আল্লহর নিকট।
আজ থেকে ৫৫ বছর আগে আমার পিতা মরহুম শাহজাহান শিকারী সাহেব মোংলায় রাজনীতি শুরু করেন। তিনি ১৯৮১ সালে সর্বপ্রথম মোংলা পোর্ট পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড ( বর্তমান ১,২,৩ ) এর কমিশনার হিসেবে নির্বাচিত হন।
তিনি একটানা ৫ বার (২৫ বছর) কমিশনার ও প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ১৪ মাস মোংলা পোর্ট পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন, তৎকালীন তার সদস্য সংখ্যা ছিলো প্রায় ২৯ হাজার। তখন তিনি মোংলা বন্দর শ্রমিক সংঘের সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
১৯৮৫ সালে তিনি মোংলা বন্দর শ্রমিক সংঘের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তিতে তিনি ১১ বার ( ২২ বছর ) মোংলা বন্দর শ্রমিক সংঘের সভাপতি হিসেবে সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে অত্র অঞ্চলের সকল উন্নয়ন সংগ্রামের সাথে সরাসরি নিজেকে সংযুক্ত রাখেন।
১৯৯২ সালে রুপসা সেতু নির্মান আন্দলনে তিনি নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং রুপসা সেতু নির্মানের সিদ্ধান্ত নিতে তৎকালীন বিএনপি সরকারকে বাধ্য করার লক্ষে মোংলা বন্দরসহ সমগ্র খুলনাঞ্চলে ৭২ ঘন্টার সর্বাত্মক ধর্মঘট পালনে মুখ্য ভুমিকা গ্রহন করেন। যা পরবর্তীতে রুপসা সেতু বাস্তবায়নে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে।
তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ১৯ জনের একটি দল নিয়ে অত্র এলাকায় যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তি যোদ্ধাদের সহায়তায় খাবার যোগানের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। যার স্বিকৃতী স্বরুপ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত ১৯৭২ সালের ৩০ মে তাকেসহ উক্ত ১৯ জনকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বেচ্ছাসেবক এর সার্টিফিকেট প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু।
তিনি মোংলা বন্দরের কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ২৩ টি ক্যাটাগরীর শ্রমিক সংগঠন বৃহত্তর মোংলা বন্দর শ্রমিক কর্মচারী ওয়েলফেয়ার সংঘ এর প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে মোংলা বন্দরে এই সংগঠনের আওতাভুক্ত প্রায় ২৪ হাজার শ্রমিক - কর্মচারীরা ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহনের জন্য ১৯৭৬ সালে ও ১৯৭৭ সালে অন্ততো ৩/৪ বার কারাভোগ করেন।
তিনি তৎকালীন স্বৈরশাষক জিয়ার বিরুদ্ধে স্হানীয়ভাবে হাজারো মানুষ নিয়ে মিছিল করার জন্য ডিটেনশনে ১ মাস ১৬ দিন কারাভোগ করেন। তিনি ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার পতনের আন্দোলনে বিরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে এই আন্দোলন তরান্বিত করার জন্য মোংলা বন্দরে একটানা সাতদিন সর্বাত্মক হরতাল পালন করেন এবং বিদেশী জাহাজের সকল পন্য আমদানী রফতানির কাজ শ্রমিকদের সহযোগিতায় বন্ধ রাখতে সক্ষম হন। যা তৎকালীন এরশাদ সরকারের উপর আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক চাপ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়।
তিনি ১৯৯৫ সালে তৎকালীন ফেসিষ্ট খালেদার সরকার পতনের আন্দোলনের সময় মোংলায় সর্বাত্মক গনআন্দোলন ও হরতালে সর্বাগ্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তখন আমাদের বাড়ী থেকে হাজার হাজার মানুষের জন্য খিচুড়ী রান্না করে তা প্যাকেট করে বস্তায় ভরে নদীর ওপারের বাসষ্টান্ডে আমিসহ আরো অনেকে সেই খিচুড়ী ভর্তি বস্তা মাথায় করে নিয়ে গিয়ে আন্দোলনরত আওয়ামী নেতা কর্মীদের খাওয়াতাম। এছাড়া তৎকালীন সময়ে আমার পিতা মরহুম শাহজাহান শিকারী শতশত বস্তা চিড়া ও গুড় আনিয়ে আন্দোলনরত আওয়ামী নেতা কর্মীদের খুদা নিবারনের চেষ্টা করতেন। এভাবে তিনি মাসের পর মাস আওয়ামী লীগের সকল আন্দোলন সংগ্রামে সর্বাগ্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
তিনি ১৯৯৭ সালে মোংলা পৌর আওয়ামী লীগ এর সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। পরবর্তিতে তিনি ১৯৯৯ সালে মোংলা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি মোংলা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন সময়ে বিএনপি অধ্যুসিত মোংলা পৌরসভায় ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে তিনি মোংলা পৌর আওয়ামী লীগকে একটি সুসংগঠিত সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। এর ফল স্বরুপ বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তার এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ নেতা কর্মীদের উপর নেমে আসে চরম অত্যাচার ও নির্যাতন।
২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমাদের নামে ১৪ টি মিথ্যা রাজনৈতিক মামলা দেয় বিএনপি জামায়াতের নেতারা। আমি নিজেও তৎকালীন সময়ে বিএনপির মিথ্যা মামলায় দুই মাস কারাভোগ করি। ২০০৬ সালে লগী -বৈঠার আন্দোলনে মোংলা বন্দরে তিনি ব্যাপক প্রভাবশালী আন্দোলন সংগঠিত করতে সক্ষম হন এবং সেই আন্দোলনে তিনি যাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম করেছিলেন, সেই বিরোধী বিএনপি জামায়াতের নেতারা আজ আওয়ামী লীগের হর্তাকর্তা হয়েছেন। আজ সেই সব জামাত, বিএনপি ও শিবীর থেকে আগত সন্ত্রাসী গোষ্টি মোংলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছ্বাসেবক লীগের উপজেলা ও পৌরসভার সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতা হয়ে প্রকৃত ত্যাগী আওয়ামী নেতা কর্মীদের উপর জুলুম অত্যাচার, নির্যাতন চালাচ্ছে। প্রশ্ন হলো- এদের আওয়ামী লীগে এনে পূর্ণবাসন ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পদায়ন কে বা কারা করেছেন? কার ছত্রছায়ায় এরা আজ রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে? পরবর্তীতে নেত্রীকে মুক্ত করার আন্দোলনে আমার পিতা মরহুম শাহজাহান শিকারী সাহেবের ভূমিকার বিষয়ে মোংলার প্রকৃত ত্যাগী আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ আমার চেয়ে অনেক ভালো বলতে পারবেন।
আমার পিতা তার জীবদ্দশায় কখনো কোন দিনও আওয়ামী নীতি আদর্শ বিচ্যুত হননি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিএনপির তৎকালীন বাগেরহাট -২ আসনের এমপি সিলভার সেলিম সাহেব আমার পিতার কাছে মোংলার বিএনপির নেতাদের দিয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন, বিএনপির থানা কমিটির সভাপতি ও মোংলা পোর্ট পৌরসভার বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী হওয়ার জন্য। পাশাপাশি নির্বাচনী খরচ হিসেবে কোটি টাকার প্রস্তাবসহ অনেক লোভনীয় প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন, বিএনপির থানা কমিটির সভাপতি ও মোংলা পোর্ট পৌরসভার বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী হওয়ার জন্য। পাশাপাশি নির্বাচনী খরচ হিসেবে কোটি টাকার প্রস্তাবসহ অনেক লোভনীয় প্রস্তাব ছিলো।
আমার পিতা মরহুম শাহজাহান শিকারী সাহেবের কাছে এ সব স্বার্থের উর্ধে ছিলো বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রতি অবিচল আস্হা, শ্রদ্ধা ও নির্মোহ ভালোবাসা। তিনি কখনোই তার আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি। তাকে কোন লোভই জননেত্রী শেখ হাসিনা মহোদয় এর সান্নিধ্য থেকে সরাতে পারেনি। আমার পিতা মরহুম শাহজাহান শিকারী সাহেব অসুস্হ অবস্হায় অক্সিজেন মাস্ক ও সিলিন্ডার সাথে নিয়েও আওয়ামী লীগের সকল মিছিল মিটিং এ অংশগ্রহন করেছিলেন, যার প্রমান মোংলার হাজার হাজার আওয়ামী নেতা কর্মীবৃন্দরা।
তিনি মোংলার আওয়ামী রাজনৈতিক ইতিহাসের একমাত্র নেতা, যিনি কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে সরাসরি ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কারো দয়ায় বা দানে মরহুম শাহজাহান শিকারী সাহেব কখনোই নেতা হননি। তিনি নিজ যোগ্যতা ও মেধায় তার জায়গা তৈরী করেছিলেন। তিনি আমৃত্যু আওয়ামী লীগের একজন নিষ্ঠাবান সৎ সাহসী কর্মী হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
তার জীবদ্দশায় কখনোই কোন আগত হাইব্রীডরা আওয়ামী রাজনিতীতে মাথা তুলে আওয়ামী কর্মীদের দিকে রক্তচক্ষু দেখাতে সাহস পায়নি। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালের ৫ মার্চ ইন্তেকাল করেন।
মহান আল্লহ রাব্বুল আলআমীন তাকে তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমীন।
কিন্তু বিনিময়ে তিনি কি পেয়েছিলেন......?
আর একদিন না হয় সেই না পাওয়ার বেদনা গুলো বলবো।
আর একদিন না হয় সেই না পাওয়ার বেদনা গুলো বলবো।
লেখকঃ
এ এইচ মিলন শিকারী
শাহজাহান শিকারীর জেষ্ঠ্য পুত্র ।
সভাপতি, মোংলা উপজেলা শ্রমিক লীগ

.jpg)